অটিজমে স্টিমিং (Stimming) কী? শিশুরা কেন হাত ঝাপটায় ও ঘোরে?
পার্কে খেলতে গিয়ে কিংবা কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে হয়তো খেয়াল করেছেন, আপনার সন্তান হঠাৎ করেই খুব দ্রুত হাত ঝাপটাতে শুরু করেছে (Hand flapping)। কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই সে নিজের চারপাশে বনবন করে ঘুরছে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট খেলনার চাকা সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরিয়েই যাচ্ছে।
আশপাশের মানুষ যখন অবাক দৃষ্টিতে তাকায়, তখন বাবা-মা হিসেবে অস্বস্তিতে পড়াটা খুব স্বাভাবিক। অনেকেই ধমক দিয়ে বা জোর করে শিশুর এই আচরণ থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় শিশুর এই অদ্ভুত আচরণের একটি নির্দিষ্ট নাম আছে? একে বলা হয় ‘স্টিমিং’ (Stimming)।
নিউ লাইফ হোমিও (New Life Homeo)-এর আজকের এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আমরা জানবো স্টিমিং আসলে কী, কেন শিশুরা এমন করে এবং এই ক্ষেত্রে বাবা-মায়েদের সঠিক করণীয় কী হওয়া উচিত।
স্টিমিং (Stimming) জিনিসটা আসলে কী?
’স্টিমিং’ শব্দটির পূর্ণরূপ হলো Self-Stimulatory Behavior বা স্ব-উদ্দীপক আচরণ। সোজা কথায়, নিজের স্নায়ুকে শান্ত করতে বা শরীরের ভেতরে তৈরি হওয়া কোনো চাপকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে মানুষ যেসব পুনরাবৃত্তিমূলক (Repetitive) কাজ করে, তাকেই স্টিমিং বলে।
মজার ব্যাপার হলো, স্টিমিং শুধু অটিস্টিক শিশুরাই করে না। সাধারণ মানুষও নিজেদের অজান্তে স্টিমিং করে। যেমন—টেনশন হলে বারবার পা নাড়ানো, কলমের পেছনের অংশ কামড়ানো, বা নখ খোঁটা। এগুলোও এক ধরণের স্টিমিং।
পার্থক্য হলো, সাধারণ মানুষের স্টিমিংগুলো সমাজের চোখে খুব বেশি অস্বাভাবিক লাগে না। কিন্তু স্পেকট্রামে থাকা (অটিস্টিক) শিশুদের স্টিমিংয়ের ধরনগুলো একটু ভিন্ন এবং তীব্র হয়।
অটিস্টিক শিশুদের স্টিমিংয়ের সাধারণ ধরনগুলো
একেক শিশুর স্টিমিংয়ের ধরন একেক রকম হতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়গুলো চোখে পড়ে:
- শারীরিক (Motor Stimming): হাত ঝাপটানো (Flapping), নিজের চারপাশে ঘোরা, সামনে-পেছনে দোল খাওয়া (Rocking), বা পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে হাঁটা।
- দৃষ্টিগত (Visual Stimming): চোখের খুব কাছে নিয়ে আঙুল নাড়ানো, ফ্যানের ঘোরা বা গাড়ির চাকার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, কিংবা বারবার লাইট অন-অফ করা।
- শ্রবণগত (Auditory Stimming): একই শব্দ বা বাক্য বারবার উচ্চারণ করা, কানে আঙুল দিয়ে শব্দ তৈরি করা।
- স্পর্শগত (Tactile Stimming): নির্দিষ্ট কোনো কাপড় বা টেক্সচার বারবার হাত দিয়ে ঘষা।
শিশুরা কেন বারবার এমন আচরণ করে? এর পেছনের বিজ্ঞান
শিশুরা ইচ্ছে করে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য বা দুষ্টুমি করে এই কাজগুলো করে না। এর পেছনে রয়েছে তাদের মস্তিষ্কের ‘সেন্সরি প্রসেসিং’ বা স্নায়বিক তথ্য আদান-প্রদানের ভিন্নতা। মূলত ৩টি কারণে তারা স্টিমিং করে:
১. সেন্সরি ওভারলোড (Sensory Overload) সামলাতে
অটিস্টিক শিশুদের মস্তিষ্ক চারপাশের আলো, শব্দ বা গন্ধকে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক তীব্রভাবে গ্রহণ করে। ধরুন, আপনি একটি শপিং মলে গেছেন। সেখানকার কোলাহল, মানুষের কথা, উজ্জ্বল আলো—সব মিলিয়ে শিশুর মস্তিষ্কে একসঙ্গে প্রচুর তথ্য প্রবেশ করে। মস্তিষ্ক যখন এত তথ্য একসাথে প্রসেস করতে পারে না, তখন শিশু চরম চাপ অনুভব করে। এই অতিরিক্ত চাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে শান্ত হতে শিশু হাত ঝাপটায় বা কান ঢেকে স্টিমিং করে।
২. স্নায়ুকে উদ্দীপ্ত করতে (Under-stimulation)
কখনো কখনো এর উল্টোটাও ঘটে। যদি পরিবেশ খুব বেশি শান্ত থাকে বা শিশুর স্নায়ু পর্যাপ্ত উদ্দীপনা না পায়, তখন সে নিজেই শব্দ করে বা শরীর দুলিয়ে নিজের স্নায়ুকে সচল রাখার চেষ্টা করে।
৩. আবেগ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে
যেহেতু অনেক অটিস্টিক শিশু কথা বলতে পারে না বা মনের কথা গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে না, তাই স্টিমিং তাদের একটি ভাষা। অতিরিক্ত আনন্দ পেলে, রেগে গেলে বা চিন্তিত হলে তারা হাত ঝাপটে বা লাফিয়ে সেই অবস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
বাবা-মা হিসেবে কী করবেন? স্টিমিং কি জোর করে বন্ধ করা উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টিমিং যদি শিশুর নিজের জন্য বা অন্যের জন্য ক্ষতিকর না হয়, তবে তা জোর করে বন্ধ করা উচিত নয়। স্টিমিং তাদের ভালো থাকতে সাহায্য করে। আপনি যদি জোর করে তার হাত ঝাপটানো বা ঘোরা বন্ধ করে দেন, তবে তার ভেতরের চাপটা বের হতে পারবে না। এতে তার মধ্যে তীব্র মেজাজ হারানো বা ‘মেল্টডাউন’ (Meltdown) দেখা দিতে পারে।
তবে স্টিমিং যদি তাকে পড়াশোনা বা স্বাভাবিক কাজ থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখে, অথবা সে যদি স্টিমিং করতে গিয়ে নিজেকে আঘাত করে (যেমন—দেয়ালে মাথা ঠোকা বা নিজেকে কামড়ানো), তখন অবশ্যই বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিউ লাইফ হোমিও এবং ডা. আবু মুছা খানের চিকিৎসা দর্শন
আধুনিক ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি স্টিমিংয়ের তীব্রতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি দারুণ কার্যকরী। অ্যালোপ্যাথিতে অনেক সময় স্নায়ু নিস্তেজ করার ওষুধ দেওয়া হয়, যা সাময়িকভাবে আচরণ বন্ধ করলেও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে পারে।
এখানেই নিউ লাইফ হোমিও ভিন্নভাবে কাজ করে। আমাদের প্রধান চিকিৎসক ডা. আবু মুছা খান (ডিএইচএমএস) গত ৫০ বছর ধরে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এই শিশুদের চিকিৎসা করে আসছেন। মাদার তেরেসা ও মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত এই চিকিৎসক বিশ্বাস করেন, জোর করে স্টিমিং বন্ধ করার কিছু নেই।
বরং, আমরা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মাধ্যমে শিশুর মস্তিষ্কের ‘অতি-সংবেদনশীলতা’ বা হাইপার-সেন্সিটিভিটি কমিয়ে আনার কাজ করি। যখন ভেতর থেকে শিশুর স্নায়ুগুলো শান্ত হতে শুরু করে এবং সে চারপাশের পরিবেশের সাথে স্বাভাবিকভাবে মানিয়ে নিতে শেখে, তখন তার অতিরিক্ত স্টিমিং করার প্রয়োজনীয়তা আপনাআপনি কমে যায়। এটি কোনো ম্যাজিক নয়, এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন একটি আরোগ্য প্রক্রিয়া।
আপনার সন্তানের স্নায়বিক অস্থিরতা কমিয়ে তাকে একটি সুন্দর জীবন দিতে আজই সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। আপনার যেকোনো জিজ্ঞাসায় আমরা আছি আপনার পাশে।
📞 পরামর্শের জন্য কল করুন: 01704755879
🌐 ওয়েবসাইট: newlifehomeo.com
🏥 ঠিকানা: নিউ লাইফ হোমিও (ডা. আবু মুছা খান), ঢাকা।